Home / Hindu / স্বর্গীয় স্থপতিরা এক রাতেই তৈরি করেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মন্দির!

স্বর্গীয় স্থপতিরা এক রাতেই তৈরি করেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মন্দির!

স্বর্গীয় স্থপতিরা এক রাতেই তৈরি করেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মন্দির! – অ্যাংকর ওয়াট কম্বোডিয়ার একটি মন্দির কমপ্লেক্স। দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপত্যটি শুধু কম্বোডিয়ার নয় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যের মধ্যে একটি। ১৬২ দশমিক ছয় হেক্টর জায়গা

জুড়ে অবস্থিত এই সুবিশাল মন্দির কমপ্লেক্সটি। মূলত হিন্দু মন্দির হিসেবে নির্মিত হয়েছিল এটি। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয় এটি। অ্যাংকর ওয়াট মন্দিরটি মধ্যযুগীয় ধ্রুপদী স্থাপত্য নিদর্শন। এটি কম্বোডিয়ার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির জাতীয় পতাকাতেও স্থান পেয়েছে মন্দিরটি। খেমার ভাষায় অ্যাংকর ওয়াট শব্দের অর্থ

‘মন্দিরের নগর’। ১৬ শতক থেকে মন্দিরটির নাম অ্যাংকর ওয়াট। অ্যাংকর শব্দটি এসেছে নগর শব্দ থেকে। এটি মূলত সংস্কৃত নগর শব্দের অপভ্রংশ। আর খেমার ভাষায় ওয়াট শব্দের অর্থ মন্দির। অতীতের অ্যাংকর ওয়াট অতীতের অ্যাংকর ওয়াট

ইতিহাস
অ্যাংকর ওয়াট মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। সেসময় অ্যাংকর ছিল খেমার সাম্রাজ্যের রাজধানী। হিন্দু মন্দির হিসেবে নির্মিত হয়েছিল এটি। রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণের রাজত্বকালে (১১১৩-১১৫০) বিষ্ণু ছিল এই মন্দিরের উপাস্যদেবতা। একই সঙ্গে এটি রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণের রাজধানী এবং মূল মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মন্দিরটি নির্মাণের সমসাময়িক কোনো শিলালিপি কিংবা লিখিত কোনো ইতিহাস পাওয়া যায়নি। ফলে এর আদি নাম কি ছিল তা অজ্ঞাতই রয়ে গিয়েছে। এখানে বিষ্ণুর উপাসনা করা হতো, সে কারণেই ধারণা করা হয়’ বরাহ বিষ্ণু-লোক’ নামে পরিচিত ছিল।

অ্যাংকর ওয়াট মন্দির অ্যাংকর ওয়াট মন্দির
মন্দিরটি কম্বোডিয়ার আধুনিক সিয়েম রিপ শহরের সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে এবং প্রাচীন রাজধানী বাফুওন শহরের দক্ষিন-পূর্বে অবস্থিত। কম্বোডিয়ার এই অঞ্চলে অ্যাংকর ওয়াট মন্দিরটি ছাড়াও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন স্থাপত্য রয়েছে। একটি পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ইন্দ্র মন্দিরটি তৈরির আদেশ দিয়েছিলেন। ১৩ শতাব্দীর বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক চৌ দাগুয়ান এর বর্ণনা মতে, অনেকে বিশ্বাস করতেন স্বর্গীয় স্থপতিরা এক রাতে মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন। ১১৫০ সালে

খামের রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণের মৃত্যুর পর মন্দিরটির নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখনো দেয়ালের কারুকার্যসহ অনেক কিছু অসমাপ্ত ছিল। তার মৃত্যুর পর বাকি কাজ শেষ হয়। খমেরদের চির শত্রু ছিল চাম জাতিগোষ্ঠী। সূর্যবর্মণের মৃত্যুর ২৭ বছর পর ১১৭৭ সালে চামেরা অ্যাংকর শহর দখল করে ধ্বংসলীলা চালায়। ১১৮১ সালে খমের রাজা সপ্তম জয়বর্মণ শহরটি পুনর্গঠন করেন। তিনি অ্যাংকরের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে বাওয়ন নগরে নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় কম্বোডিয়ায় সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটে। ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ধর্মের

প্রচলন ঘটে। উপর থেকে মন্দিরের দৃশ্য উপর থেকে মন্দিরের দৃশ্য দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে অ্যাংকর ওয়াট হিন্দু মন্দির থেকে বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। এরপর ১৩, ১৪ এবং ১৫ শতকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। অবশ্য ১৬ শতকে মন্দিরটির গুরুত্ব বেশ কমে যায়। তবে মন্দিরটি কখনোই পরিত্যক্ত হয়নি। ১৭ শতকে জাপানি বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীদের কাছে মন্দিরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা এর চারপাশে ছোট ছোট বসতিও স্থাপন করেছিল। সেসময় জাপানি তীর্থযাত্রীরা

এটিকে বুদ্ধের বিখ্যাত জেতাভানা উদ্যান ভাবত। যা মূলত ভারতের মগধ রাজ্যে অবস্থিত। পর্তুগিজ খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক অ্যান্তোনিও দ্য মাদালেনা ১৫৮৬ সালে এই মন্দির অঞ্চলে ভ্রমণ করেছিলেন। পশ্চিমাদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই মন্দির ভ্রমণকারী। মন্দিরটি দেখার পর তিনি বলেছিলেন, মন্দিরটির নির্মাণ এতোটাই অসাধারণ যা বর্ণনা করা অসম্ভব। বিশ্বের আর কোথাও এতো সুন্দর মন্দিরের অস্তিত্ব নেই। এই স্থাপত্যের খিলান এবং অন্যান্য কারুকার্য মানুষের সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ কারুকার্য।‘ পশ্চিমা বিশ্বে অ্যাংকর ওয়াট মন্দির সর্বাধিক পরিচিতি পেয়েছিল বিখ্যাত ফরাসি প্রকৃতিবিদ এবং আবিষ্কারক

হেনরি মৌহাত এর ভ্রমণ কাহিনী প্রকাশের মাধ্যমে। তিনি ১৮৬০ সালে মন্দির অঞ্চলটি ভ্রমণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ভ্রমণকাহিনী প্রকাশ করেন। যেখানে অ্যাংকর ওয়াট মন্দিরের স্থাপত্য শৈলীর প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করা হয়। এর স্থপতিকে ইতালির রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত ভাস্কর, চিত্রকর এবং স্থপতি মাইকেলেঞ্জেলোর সঙ্গে তুলনা করেন।

মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী
বেশ চমৎকার মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী বেশ চমৎকার অ্যাংকর ওয়াটের স্থাপত্যশৈলী মধ্যযুগের অনন্য স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন অ্যাংকর ওয়াট মন্দির। অনেকে এর স্থাপত্যশৈলী প্রাচীন গ্রিস এবং রোমান স্থাপত্যের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। মন্দিরটির উন্নত নির্মাণ কৌশলের জন্য এটি স্থাপত্যের একটি মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। এই প্রকৃতির স্থাপত্যশৈলীকে পরবর্তীকালে অ্যাংকর ওয়াট নির্মাণ রীতি হিসেবে অভিহত করা হতো। মধ্যযুগে খামের স্থাপত্যের দুটি ধরণ ছিল। যার

একটি হলো পাহাড়ি মন্দির নির্মাণ কৌশল এবং গ্যালারি মন্দির নির্মাণ কৌশল। অ্যাংকর ওয়াট মন্দির এই দুই ধরণের সমন্বয়েই নির্মিত হয়েছে। এর কিছু অংশ পর্বতের মতো, আবার অন্য অংশ গ্যালারির আদলে নির্মিত। মন্দিরের চারপাশে তিন দশমিক ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ দেয়াল আছে। এর মধ্যে তিনটি গ্যালারি আকৃতির উঁচু অঞ্চল আছে। যা অনেকটা হিন্দু পুরাণে বর্ণিত দেবতাদের আবাস মেরু পর্বতের মতো। যেখানে পাঁচটি পর্বত শৃঙ্গের প্রতীক হিসেবে পাঁচটি টাওয়ার নির্মিত হয়েছে। সমগ্র মন্দিরটি একটি পরিখার মধ্যে। দ্বাদশ শতাব্দীতে খামের স্থপতিরা ইটের পরিবর্তে স্যান্ডস্টোন ব্যবহারের

কৌশল আয়ত্ত করেছিল। মন্দিরের মূল স্থাপনা স্যান্ডস্টোন দ্বারা তৈরি। মন্দিরের প্রবেশমুখ মন্দিরের প্রবেশমুখ মূলভবনের দৃশ্যমান বেশিরভাগ অংশ পাথরের ব্লক। পাথরের ব্লকগুলো মার্বেলের মতো মসৃণ করা। মন্দিরটি নির্মাণ কাজে প্রায় ১০ মিলয়ন স্যান্ডস্টোন ব্লক ব্যবহৃত হয়েছে। যার মধ্যে অনেক পাথরের ব্লকের ওজন প্রায় দেড় টন পর্যন্ত। এগুলো জোড়া লাগানোর জন্য কী ব্যবহৃত হয়েছিল তা আজো অজানা। তবে প্রাকৃতিক রজন কিংবা প্রক্রিয়াজাত চুনের ব্যবহার হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

মন্দিরের মূলভবনটি
অন্যান্য স্থাপনা থেকে উঁচু স্থানে অবস্থিত। এখানে স্তর ভিত্তিক তিনটি চতুষ্কোণ গ্যালারি আছে। যার শেষ প্রান্তে স্থাপনার কেন্দ্রীয় টাওয়ার অবস্থিত। ব্রাহ্ম, বিষ্ণুর এবং শিবের উদ্দেশ্যে গ্যালারিগুলো নিবেদিত বলে অনেকে মত প্রাকাশ করেছেন। অনেকে মনে করেন, মন্দিরটি রাজার সমাধিস্তম্ভ হিসেবেও ব্যবহারের জন্য নির্মিত হয়েছিল। গ্যালারিগুলোর চারকোণার

টাওয়ার এবং কেন্দ্রের টাওয়ারের সমন্বয়ে পঞ্চবিন্দুর নকশা ধারণ করেছে। মন্দিরের ভিতরের দেওয়ালগুলোর কারুকার্য এবং নকশার ক্ষত্রে হিন্দু পৌরাণিক অনুষঙ্গ অনুসরণ করা হয়েছে। হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ এবং মহাভারতে বর্ণিত অনেক ঘটনা এখানে চিত্রিত রয়েছে। গ্যালারির উত্তর-পশ্চিম কোণে রামায়নের লঙ্কার যুদ্ধ, মহাভারতের কুরুক্ষত্রের যুদ্ধের অনেক ঘটনা পাথরে খোঁদাই করা আছে। পূর্ব গ্যালারিতেও পৌরাণিক দৃশ্য চিত্রকর্ম রয়েছে। বর্তমান সময়ের একটি গবেষণা থেকে জানা যায়,

মন্দিরটির দেয়ালগুলোতে দেবতা এবং অপ্সরার চিত্র আছে প্রায় ১৮০০টি। পশ্চিমে মুখ করে রয়েছে মন্দিরটি পশ্চিমে মুখ করে রয়েছে মন্দিরটি মন্দিরটি পশ্চিমমুখীখামের মন্দিরগুলো সাধারণত পূর্বমুখী। তবে অ্যাংকর ওয়াট পশ্চিমমুখী। ধারণা করা হয়, মন্দিরটি অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় পশ্চিম দিকে মুখ করে নির্মিত হয়েছিল। তবে গবেষক ফ্রিম্যান এবং জ্যাকের মতে বিষ্ণু দেবতার প্রতি নিবেদিত বলে মন্দিরটি পশ্চিম দিক করে নির্মিত। কারণ হিন্দু ধর্ম মতে, বিষ্ণু দেবতার সঙ্গে পশ্চিম দিকের সম্পৃক্ততা আছে। অন্য একটি মতবাদও প্রচলিত আছে, মন্দিরটির পশ্চিমমুখী হওয়ার বিষয়ে।

হিন্দু ধর্মানুসারে, পূর্ব দিকের সঙ্গে মৃত্যুর বিষয়টি জড়িত। জানা যায়, রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ এর নির্মাণ কাজ শুরুর সময় তার সমাধি তৈরিরও নির্দেশ দিয়েছিলেন। সম্ভবত তার বিশ্বাস ছিল পূর্বমুখী না হয়ে তার সমাধি পশ্চিমমুখী হলে তার শাসনকাল দীর্ঘ দিন মানুষ স্মরণ করবে। মন্দিরটি দেখতে সত্যিই অসাধারণ মন্দিরটি দেখতে সত্যিই অসাধারণ

মন্দিরটির বর্তমান অবস্থা
২০ শতকের প্রথমার্ধে অ্যাংকর ওয়াট মন্দিরের বেশ কিছু অংশ সংস্কার করা হয়েছিল। ১৯৭০ এবং ৮০ এর দশকে কম্বোডিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় এর সংস্কার কাজ স্থগিত ছিল। সে সময় এর বাইরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মূল স্থাপনা অক্ষতই ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯০ এর দশক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এর রক্ষণাবেক্ষণ শুরু হয়। ইউনেস্কো ১৯৯২ সালে

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জার্মানির একটি প্রকল্পের অধীনে দেওয়ালের নকশা বান কারুকার্য সংস্করণ এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ২০০৫ সালে জাপানের বিশেষজ্ঞরা এর কিছু অংশ মেরামত করে। এটি বর্তমানে কম্বোডিয়ার মূল পর্যটন কেন্দ্র। ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস

Check Also

তারা মায়ের স্বপ্নাদিষ্ট অব্যর্থ ওষুধ খেয়ে সুস্থ হন রোগীরা, রয়েছে ৪০০ বছরের প্রাচীন মন্দিরের মাহাত্ম্য

তারা মায়ের স্বপ্নাদিষ্ট অব্যর্থ ওষুধ খেয়ে সুস্থ হন রোগীরা, রয়েছে ৪০০ বছরের প্রাচীন মন্দিরের মাহাত্ম্য ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *